img

কবিতা প্রসঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন অনেক। সুনীল সম্পর্কে সুনীলের রচনার এক জায়গায় তিনি লিখেছিলেন – ‘কবিতা লিখতে আমার কষ্ট হয়। আমি ইদানীং গল্প-উপন্যাসও রচনা করে থাকি, কিন্তু ওসবের তুলনায় কবিতা রচনার কষ্ট অনেক বেশি। এই শব্দ নিয়ে নাড়াচাড়া করা যে কী সাঙ্ঘাতিক বিপজ্জনক ব্যাপার– ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যে তা বুঝবে না। যেন একটু অসতর্ক হলেই আঙুল ঝলসে যাবে কিংবা তুষার ক্ষত হবে। শব্দের এই খেলার সময় সমস্ত স্নায়ু এমন উগ্র টনটনে হয়ে থাকে যে তার ফলে শারীরিক যন্ত্রণা হতে পারে। কবিমাত্রই যে কারণে কিছু না কিছুভাবে অসুস্থ। …ভালোবাসারই মতন, কবিতা নেয় অনেক বেশি, দেয় খুব কম। শুষে নেয় জীবনীশক্তি, ফিরিয়ে দেয় শুধু সম্ভাবনার ঝলক।’

 

সুনীলের কবিতা প্রসঙ্গে বলতে হয়, তাঁর প্রতিটি কবিতাই আত্মস্বীকারোক্তিমূলক। সুনীলের এমন কোনো কবিতা খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে তিনি নিজে উপস্থিত নন। এজন্যই তাঁর কবিতাগুলো উত্তম পুরুষে (আমি, আমার, আমাকে, আমায় প্রভৃতি) লেখা। সুনীলের ভাষায়, ‘আমার প্রতিটি কবিতাই আমার জীবনযাত্রার প্রতিফলন, সেই জন্যেই আমি একাধিক জায়গায় বলেছি, আমার কবিতাগুলো স্বীকারোক্তিমূলক!’

 

অকপটেই তিনি স্বীকার করেছেন, ‘আমার এমন একটিও কবিতা নেই, যে-কবিতায় আমি ‘আমি’ শব্দটা অন্তত একবারও ব্যবহার করিনি।’ সুনীলের সরল দাবি, ‘আমি তো কবিতাতে আমার জীবনকেই ব্যবহার করেছি। আড়াল করিনি।’ কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক:

আমারও আকাঙ্ক্ষা ছিল সূর্যের দোসর হবো তিমির শিকারে

সপ্তাশ্ব রথের রশি টেনে নিয়ে দীপ্ত অঙ্গীকারে।

অথচ সময়াহত আপাত বস্ত্তর দ্বন্দ্বে দ্বিধান্বিত মনে

বর্তমান-ভীত চক্ষু মাটিতে ঢেকেছি সঙ্গোপনে। (‘প্রার্থনা’, একা এবং কয়েকজন)

অথবা,

আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ

এই কি মানুষজন্ম? নাকি শেষ

পুরোহিত-কঙ্কালের পাশা খেলা! প্রতি সন্ধেবেলা

আমার বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠে, হৃদয়কে অবহেলা

করে রক্ত; আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে

থাকি – তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে। (‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি’, আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি)

অথবা পাঠকপ্রিয় সেই উক্তি :

এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ

আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি?

…এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি

এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়? (‘সত্যবদ্ধ অভিমান’, সত্যবদ্ধ অভিমান)

অথবা সুনীলের সেই চির অম্লান কবিতা-

ভারতবর্ষের মানচিত্রের ওপর দাঁড়িয়ে

আমি পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম

নিঃশব্দ রাত্রির দেশ, তার ওপরে একজন নিঃসঙ্গ মানুষ

অদূরে খাজুরাহো মন্দিরের চূড়া

মিথুন মূর্তিগুলো দেয়াল ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠেছে আকাশে

নীল মখমলে শুয়ে নক্ষত্রদের মধ্যে চলছে শারীরিক প্রেম

আমি যে-কোনো দিকে যেতে পারি

অথচ আমার কোনো দিক নেই!(‘ভারতবর্ষের মানচিত্রের ওপর দাঁড়িয়ে’, স্বর্গ নগরীর চাবি)

 

কবিতা লেখার বিষয়ে সুনীলের সুন্দর একটি পঙ্ক্তি আছে। সেখানে প্রকাশ পেয়েছে কবিতার প্রতি এ-কবির সুন্দর ভালোবাসা: কবিতা লেখার চেয়ে কবিতা লিখবো এই ভাবনা আরও প্রিয় লাগে…মনে ফুরফুরে হাওয়া, এবার কবিতা, একটি নতুন কবিতা…তবু আমি কিছুই লিখি না। কলম গড়িয়ে যায়, ঝুপ করে শুয়ে পড়ি, প্রিয় চোখে দেখি সাদা দেয়ালকে, কবিতার সুখস্বপ্ন গাঢ় হয়ে আসে, মনে মনে বলি, লিখবো লিখবো এত ব্যস্ততা কিসের  (‘কবিতার লেখার চেয়ে’, দেখা হলো ভালোবাসা, বেদনায়)

নিজের সেরা লেখাটি লেখার তৃষ্ণা সব লেখকের মধ্যে থাকে। সুনীলেরও তেমনটি অত্যন্ত তীব্রভাবে। নিজের সেরা লেখাটি উপহার দেওয়ার বুভুক্ষা প্রতিটি কবিমনেই চলতে থাকে আমৃত্যু। এ যেন এক দিকশূন্যপুরের পথে অক্লান্ত যাত্রা। সেই লেখাটি লিখতে হবে, যে লেখাটি হয়নি। এর মধ্যে চলছে কত রকম লেখালেখি। এর মধ্যে চলছে হাজার হাজার কাটাকাটি। এর মধ্যে ব্যস্ততা, এর মধ্যে হুড়োহুড়ি। এর মধ্যে শুধু কথা রাখা আর কথা ভাঙা। শুধু অন্যের কাছে, শুধু ভদ্রতার কাছে, শুধু দীনতার কাছে কত জায়গায় ফিরে আসবো বলে আর ফেরা হয়নি (‘সেই লেখাটা’, দেখা হলো ভালোবাসা, বেদনায়)

সুনীলের প্রিয় দেশ পত্রিকায় তাঁর মৃত্যুর পর স্মরণসংখ্যায় ‘একা এবং কয়েকজন’ শিরোনামের সম্পাদকীয় লেখাটি তুলে ধরার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। সেই লেখাটিতে প্রকাশিত হয়েছে প্রয়াত কবি সুনীল সম্পর্কে মোটা দাগে অনেক জানা-অজানা কথা, মৃত্যু-পূর্ব ও মৃত্যু-পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনার বহুলীকরণ – ‘কবির মৃত্যুতে রোরুদ্যমান এই শহর। কারণ, তিনি সেই কবি, যাঁর চিন্তাচেতনা জুড়ে ছিল সর্বজনীনতার ভাব।

সৌজন্য ও সৌহার্দ্যের বিষয়ে যিনি ছিলেন সর্বাগ্রগণ্য, সেই কবির অন্তিমযাত্রা উপলক্ষে তাঁর নিজের প্রিয় শহরে তাঁকে ‘আমাদের লোক’ বলে প্রতিপন্ন করার প্রয়াসটি কারও চোখ এড়ায়নি। আশির দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে এ-রাজ্যের বামপন্থী নেতৃবর্গ মার্কিনপন্থী এক ভোগবাদী সাহিত্যিক বলেই জ্ঞান করতেন। কবিতার অনুবাদ সংক্রান্ত স্কলারশিপ নিয়ে মার্কিন মুলুকে যাওয়াই হোক অথবা মার্কিন কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে সখ্য – বঙ্গজ বামপন্থীদের চোখে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন স্রেফ সিআইএ-র একজন দালাল বই কিছু নন! তাঁর বিরুদ্ধে চরবৃত্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রমাণ না মিললেও, তাঁকে ও তাঁর সৃষ্টিকে নিয়মিত গালমন্দ করে গিয়েছেন বামপন্থীরা।

তাতে অবশ্য বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি কবি। প্রতিবাদ করার প্রয়োজনও অনুভব করেননি। কারণ, আজীবন তিনি বিশ্বাস করেছেন তিনি কবি, রাজনীতির কারবারি নন। তাই রাজপথের মিছিলে পা মেলানোর চেয়ে কলম ধরতেই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ। এখানে তিনি অক্লান্ত, অপ্রতিরোধ্য। সেই সময়েই তাঁর জনপ্রিয়তা, মানুষের সঙ্গে নাড়ির যোগ রেখে চলার অপার আগ্রহ দেখে চোখ ট্যারা হয়ে গিয়েছিল তদানীন্তন শাসক দলের।

টনক নড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই তাঁকে নিয়ে যে পড়ে গেল কাড়াকাড়ি অবস্থা! বস্তুত, তিনি যখন স্বীয় প্রতিভায় মানুষকে কাছে টানতে পেরেছেন, তখন তাঁর সেই জনপ্রিয়তাকে রাজনৈতিক কৌশলে কাজে লাগাতে চেয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন শাসকদলের প্রতিভূরা। সেদিন থেকেই কবিকে করে নিলেন তাঁদের ঘরের লোক! আবার ঘোষিতভাবেই তিনি পরিবর্তনপন্থী ছিলেন না। বরং, সুনীল লিখেছিলেন, বাম-জমানার পরে যারা এ-রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে পারে, তাদের কথা ভাবতে গেলে তাঁর বিবমিষা হয়। এ-রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল সরকারের নীতির একজন দৃঢ় ও কঠোর সমালোচক ছিলেন কবি।

ফলে তাঁর সঙ্গে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর সম্পর্কে শৈত্য থাকাই হয়তো স্বাভাবিক ছিল। সুনীলের সমালোচনায় গাত্রদাহের কারণ ঘটেছিল বলেই তাঁকে শিশু-কিশোর অকাদেমির সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দিতে সৌজন্য-শিষ্টাচারে বাধেনি পরিবর্তনপন্থী সরকারের। কিন্তু এসময়ের জনপ্রিয়তম সাহিত্যিকের মৃত্যুতে বিহবল বাঙালির আবেগ বাঁধ ভাঙতে চাইছে। আর সেই বাঁধভাঙা আবেগের ঢেউয়ে যদি বর্তমান শাসকদলের প্রবলতম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সিপিএম বিন্দুমাত্র উপকৃত হয়, তবে তা মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে মেনে নেওয়া দুরূহ!

অতএব কবির শেষযাত্রায় শোকের আবহ ভঙ্গ করে নিজের প্রবলতম ‘সাংস্কৃতিক’ উপস্থিতি ব্যতীত অন্য কোনও পন্থা জানা ছিল না তাঁর। কিন্তু আশির দশকের মধ্যভাগের মতোই কে জানে হয়তো জীবন-পারাপারের সরণি ধরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একাই চলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলেন না। সৌজন্যে, রাজনীতির সেই কয়েকজন!’

সবশেষে বরং কবিতা নিয়ে সুনীলের আত্মবিশ্লেষণটি তুলে ধরা যাক : ‘বিরলে বসে যখনই নিজের কবিতা বিষয়ে ভাবি, তখন মনে হয় কিছুই লিখতে পারিনি। যত লিখছি, যত চেষ্টা করছি, ততই বুঝতে পারছি শব্দের সেই পবিত্রতাকে স্পর্শ করা কত দুরূহ। ছেলেমানুষি বয়েস কেটে গেলে বোঝা যায় কবিতা লেখাটা ছেলেখেলা নয়, তখনই লিখতে গেলে ভয় করে।

আবার এ-কথাও ঠিক, কোনো কোনো দুর্বল মুহূর্তে নিজের দু-একটা কবিতা পড়ে বেশ লাগে। কণ্ঠ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর শ্যালিয়াপিন রেকর্ডে নিজের যৌবনের সোনালি কণ্ঠস্বর শুনে যেমন কেঁদেছিলেন, তেমনই নিজের পূর্বেকার কবিতা পড়তে পড়তে গলায় বাষ্প জমে, মনে হয়, আমিও একদিন বেঁচেছিলাম, আমারও মূল্য ছিল – যত সামান্যই হোক।’

এই বিভাগের আরও খবর